সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

সূরা আদ-দুখান-এর সহজ ব্যাখ্যা ও শিক্ষা

Introduction

এই আলোচনাটি পবিত্র কুরআনের ২৫তম পারার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূরা, সূরা আদ-দুখান-এর প্রথম ও দ্বিতীয় রুকুর ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এখানে মুফতি তারিক মাসুদ সাহেব খুব সহজভাবে বুঝিয়েছেন কেন আল্লাহ এই সূরাটি নাযিল করেছেন এবং এর মাধ্যমে আমাদের কী শিক্ষা দিতে চেয়েছেন। বিশেষ করে বরকতময় রাত, মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ এবং ইতিহাসের শক্তিশালী জাতিগুলোর পতনের কাহিনী এখানে তুলে ধরা হয়েছে।


১. বরকতময় রাত ও কুরআনের অবতারণ

রেফারেন্স: [00:28]

এই সূরার শুরুতেই আল্লাহ একটি 'বরকতময় রাত'-এর কথা বলেছেন। মুফতি সাহেব ব্যাখ্যা করেছেন যে, এই রাতটি হলো লাইলাতুল কদর

  • সহজ ব্যাখ্যা: আল্লাহ কুরআন একবারে লওহে মাহফুজ থেকে দুনিয়ার আকাশে এই রাতে নামিয়েছিলেন। এরপর দীর্ঘ ২৩ বছরে তা অল্প অল্প করে রাসূল (সা.)-এর ওপর নাযিল হয়।

  • বরকত মানে কী? বরকত মানে হলো অল্প জিনিসে অনেক বেশি কল্যাণ থাকা। যেমন: অল্প খাবারে অনেকের পেট ভরে যাওয়া বা অল্প সময়ে অনেক বেশি কাজ করতে পারা।

  • আমার চিন্তা: আমরা অনেক সময় শুধু ১৫ই শাবান বা শবে বরাতকে গুরুত্ব দেই, কিন্তু কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী লাইলাতুল কদরই হলো সেই মূল রাত যখন আল্লাহ তাঁর শ্রেষ্ঠ কিতাব উপহার দিয়েছেন।


২. ভাগ্য নির্ধারণ ও ফেরেশতাদের দায়িত্ব

রেফারেন্স: [03:49]

এই রাতে আল্লাহ আগামী এক বছরের যাবতীয় বড় বড় ফয়সালা করেন। কার কতটুকু রিজিক হবে, কে জন্মাবে আর কে মারা যাবে—এসবের তালিকা ফেরেশতাদের হাতে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

  • তাকদীরের প্রকারভেদ: মুফতি সাহেব এখানে দুটি কঠিন বিষয় সহজ করেছেন:

    1. তাকদীরে মুয়াল্লাক (ঝুলন্ত ভাগ্য): এটি দোয়া বা ভালো কাজের মাধ্যমে পরিবর্তন হতে পারে। যেমন: "যদি সে দোয়া করে তবে তার অসুখ সারবে, না করলে সারবে না।"

    2. তাকদীরে মুবরাম (অটল ভাগ্য): এটি আল্লাহর আদিম জ্ঞান, যা কখনও পরিবর্তন হয় না। আল্লাহ আগে থেকেই জানেন যে ব্যক্তিটি দোয়া করবে কি করবে না।

  • কঠিন শব্দ (তাকদীর): সাধারণ কথায় একে আমরা 'ভাগ্য' বা 'নসিব' বলি। মানে যা আগে থেকেই ঠিক করা আছে।


৩. মক্কাবাসীদের ওপর আযাব ও ধোঁয়ার কাহিনী

রেফারেন্স: [13:49]

'দুখান' শব্দের অর্থ হলো ধোঁয়া। মক্কার কাফেররা যখন রাসূল (সা.)-এর কথা শুনছিল না, তখন তাদের ওপর এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ আসে।

  • ঘটনাটি কী ছিল? খাবারের অভাবে মক্কার মানুষ এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল যে, তারা আকাশের দিকে তাকালে ক্ষুধার চোটে সবকিছু ধোঁয়াটে দেখত। তারা তখন আল্লাহর কাছে ওয়াদা করেছিল যে, আযাব সরিয়ে নিলে তারা ঈমান আনবে। কিন্তু আযাব চলে যাওয়ার পর তারা আবার আগের মতো হয়ে যায়।

  • সহজ বিশ্লেষণ: মানুষ বিপদে পড়লে খুব আল্লাহ-আল্লাহ করে, কিন্তু বিপদ কেটে গেলেই আবার আল্লাহকে ভুলে যায়—এটিই এই অংশে বোঝানো হয়েছে।


৪. ফেরাউন ও বনী ইসরাঈলের শিক্ষা

রেফারেন্স: [24:48]

আল্লাহ এখানে ফেরাউনের বিশাল সাম্রাজ্যের পতনের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। ফেরাউন অনেক শক্তিশালী ছিল, কিন্তু তার অহংকার তাকে ধ্বংস করে দেয়।

  • পার্থিব মোহ: ফেরাউন মারা যাওয়ার পর তার বাগান, প্রাসাদ এবং ধন-সম্পদ সব পড়ে ছিল। না আকাশ তার জন্য কেঁদেছে, না জমিন।

  • বনী ইসরাঈলের শ্রেষ্ঠত্ব: আল্লাহ বনী ইসরাঈলকে ওই সময়ের জন্য শ্রেষ্ঠ জাতি করেছিলেন কারণ তাদের কাছে আল্লাহর কিতাব ও নবীরা ছিলেন।

  • সহজ কথা: ক্ষমতা বা টাকা কাউকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে না যদি আল্লাহর সাথে সম্পর্ক ভালো না থাকে।


৫. পরকাল ও পুনরুত্থান

রেফারেন্স: [33:43]

কাফেররা বলত, "আমরা তো একবার মরে গেলে শেষ, আবার কীভাবে বেঁচে উঠব?" তারা চ্যালেঞ্জ করত যে, "আমাদের মৃত বাপ-দাদাদের জিন্দা করে দেখাও।"

  • আল্লাহর যুক্তি: আল্লাহ বলেছেন, এই মহাবিশ্ব কি এমনি এমনি বা কোনো খেলার ছলে বানানো হয়েছে? অবশ্যই না। যদি বিচার না থাকে, তবে ভালো আর মন্দের পার্থক্য থাকবে না।

  • ফয়সালার দিন: একটি নির্দিষ্ট দিন আছে (কিয়ামত), যেদিন কেউ কাউকে সাহায্য করতে পারবে না, একমাত্র আল্লাহ যাকে দয়া করবেন সে ছাড়া।


বিশ্লেষণ ও শেষ কথা

এই আলোচনার মূল সুর হলো—মানুষের জীবন উদ্দেশ্যহীন নয়। আমার পর্যবেক্ষণ ও পরামর্শ: ১. বাস্তবতা: ভিডিওটিতে মুফতি সাহেব বুঝিয়েছেন যে, ইতিহাস (যেমন ফেরাউনের পতন) আমাদের বর্তমানের অহংকার দমানোর জন্য যথেষ্ট। আমরা বর্তমানে প্রযুক্তিতে অনেক উন্নত হতে পারি, কিন্তু স্রষ্টার আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নই। ২. বিকল্প চিন্তা: আমাদের শুধু দোয়া বা ভাগ্যের ওপর বসে থাকলে চলবে না। আলোচনায় এসেছে যে, "ইলাজ করলে সুস্থ হবে"—অর্থাৎ কর্ম এবং দোয়া দুটোরই প্রয়োজন। ৩. পরিমাপ: সূরা আদ-দুখান আমাদের শিখায় যে, বিপদ আসলে যেমন আমরা নরম হই, সুখের সময়েও যেন সেই কৃতজ্ঞতা বজায় রাখি।

সারকথা: আল্লাহ অত্যন্ত দয়ালু (রহমান), কিন্তু যারা বারবার সুযোগ পেয়েও অবাধ্য হয়, তাদের জন্য ফয়সালার দিনটি খুব কঠিন হবে। তাই সময় থাকতেই নিজেকে সংশোধন করা বুদ্ধিমানের কাজ।

[

Tafseer-e-Quran Class # 510 Surah Ad-Dukhan Ruko # 1/2 | Mufti Tariq Masood Speeches

Mufti Tariq Masood Speeches · 14K views

](http://www.youtube.com/watch?v=KpkMvvkjg10)

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সিজ্জিন (Sijjin) vs ইল্লিয়িন (Illiyin) পার্থক্য Difference

Sijjin (سِجِّين) এবং Illiyin (عِلِّيِّين) —এ দুটি শব্দ কুরআনে এসেছে এবং দুটোই মানুষের আমলনামা সংরক্ষণ সম্পর্কিত স্থানকে নির্দেশ করে। ১. সিজ্জিন (Sijjin) সিজ্জিন হলো পাপীদের (কাফের, মুনাফিক ও দুরাচারীদের) আমলনামা সংরক্ষণের স্থান। এটি সাত তলদেশের নীচে এক কারাগার বা অন্ধকার জগতে অবস্থিত বলে উল্লেখ রয়েছে। সূরা আল-মুতাফফিফীন (৮৩:৭-৯) তে বলা হয়েছে: "كَلَّا إِنَّ كِتَابَ الْفُجَّارِ لَفِي سِجِّينٍ ۝ وَمَا أَدْرَاكَ مَا سِجِّينٌ ۝ كِتَابٌ مَرْقُومٌ" অর্থ: "না, পাপীদের আমলনামা সিজ্জিনে সংরক্ষিত। তুমি কি জানো, সিজ্জিন কী? এটি এক লিখিত দলিল।" সিজ্জিনকে একটি কারাগার, সংকীর্ণ স্থান, বা নিচের স্তরে অবস্থিত এক অন্ধকার দুনিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। ২. ইল্লিয়িন (Illiyin) ইল্লিয়িন হলো সৎকর্মশীলদের (মুমিন ও নেককারদের) আমলনামা সংরক্ষণের স্থান । এটি সপ্তম আসমানের ওপরে সংরক্ষিত এক সম্মানিত স্থান। সূরা আল-মুতাফফিফীন (৮৩:১৮-২১) তে বলা হয়েছে: "كَلَّا إِنَّ كِتَابَ الْأَبْرَارِ لَفِي عِلِّيِّينَ ۝ وَمَا أَدْرَاكَ مَا عِلِّيُّونَ ۝ كِتَابٌ مَرْقُومٌ ۝ يَش...

তারাবিহ সমগ্র - প্রথম আলো

রামাদান ২০২৪ উপলক্ষে প্রথম আলোর নিয়মিত আয়োজন - খতমে তারাবিহ'র সূরা গুলো নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা'র লিংক  নিচে দেওয়া হলো।  লিংকে ক্লিক করলেই আপনাকে আলোচনা তে নিয়ে যাবে। তারাবিহ: ১ | একটি খুন ও গাভি নিয়ে বনি ইসরাইলের বাড়াবাড়ি তারাবিহ: ২ | নারীর মর্যাদা ও অধিকার এবং অলৌকিক তিন ঘটনা তারাবিহ: ৩ | যে ১৪ নারীকে বিয়ে করা হারাম তারাবিতে: ১২ | মহানবী (সা.)–এর আকাশভ্রমণ এবং আসহাবে কাহাফের কাহিনি

রেডমি নোট ৯ এর বিস্তারিত | Redmi Note 9 in Bangla

৩০ এপ্রিল, ২০২০ এ শাওমির ঘোষনা আসে এই ফোনটি নিয়ে। কিন্তু ফোনটি মার্কেটে আসে মে মাসের শেষের দিকে৷ করোনার কারনে ফোনটি বাংলাদেশে আসতে আরো সময় নেয়। বর্তমানে বাংলাদেশে আন অফিশিয়াল ভাবে ফোনটি পাওয়া যাচ্ছে৷ বাংলাদেশে অফিশিয়াল ভাবে এখনো ফোনটি আসার তথ্য নেয়৷ চলুন ফোনটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা যাক। শাওমি নোট সিরিজের ফোন বের করে এদের রেডমি নামে সাব ব্যান্ড৷ এদের কাজ হল এই নোট সিরিজ নিয়ে কাজ করা৷ প্রতিবছর নোট সিরিজের ১/২ টা ফোন বাজারে আসে। সাথে সেই ফোন গুলার বিভিন্ন ভার্সন (যেমন - র‍্যাম ও রমের ভিত্তিতে) বাজারে আসে। এই বছরও তারা রেডমি সিরিজের নোট ৯ বাজারে আনে। এই বছর হয়তো এই সিরিজের আরো ফোন বাজারে আসবে। ডিস্পলেঃ ফোনটির ডিসপ্লে সাইজ ৬.৫৩ ইঞ্চি। এতে আইপিএস এলসিডি ডিসপ্লে ব্যবহার করা হয়েছে। এই ফোনের ডিসপ্লে প্রটেকশন হিসেবে আছে গরিলা গ্লাস ফাইভ। স্ক্রিন আর ফোনের বডির অনুপাত প্রায় ৮৩.৫%। এই ফোনের ডিসপ্লে ফুলএইচডি মানে ১০৮০পি। এই ডিস্পলের দৈর্ঘ্য ১৯.৫ একক এবং প্রস্থ হল ৯ একক। এত বড় ফোনের কারনে এই ফোনের পিপি আই ডেনসিটি ৩৯৫। যা একটু কম। প্লাটফর্মঃ এই ফোনের অপারেটিং সিস্টেম এন্ড্রয়েড ১০ এবং এর...